২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের সূচিত আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে দেশের আপামর জনতা রাজপথে নেমে আসায় এটি এক ঐতিহাসিক সর্বাত্মক গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়। এই আন্দোলনে রিকশাচালক, দিনমজুর এবং পোশাক শ্রমিকসহ সর্বস্তরের শ্রমজীবী মানুষ সম্মুখভাগে থেকে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ স্বীকার করেন। সন্তানদের রক্ষায় সাধারণ অভিভাবক ও নারীরা বীরত্বের সাথে রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং শিক্ষক, চিকিৎসক ও আইনজীবীরা নিজেদের অবস্থান থেকে অনন্য পেশাগত ও নৈতিক সমর্থন যোগান। দেশের ভেতরে তীব্র দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রবাসীরাও রেমিট্যান্স বন্ধের ডাক দিয়ে এবং বৈশ্বিক জনমত তৈরি করে আন্দোলনে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করেন। মূলত সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও সম্মিলিত অংশগ্রহণই দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তন নিশ্চিত করে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গৌরবময় ও যুগান্তকারীঃ
আন্দোলনের সূচনা ও নেতৃত্ব প্রদানঃ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিকভাবে কোটা সংস্কারের দাবিতে এক শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের সূচনা করে, যা পরবর্তীতে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার এক বিশাল গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়।
দমন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে অদম্য প্রতিরোধঃ রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের নজিরবিহীন সহিংসতা, বুলেটের আঘাত ও দমন-নিপীড়নের মুখেও শিক্ষার্থীরা পিছু হঠেনি, বরং বুক পেতে দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
ত্যাগের মহিমা ও আত্মোৎসর্গঃ আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ শত শত শিক্ষার্থীর বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ ও শাহাদাত বরণ সাধারণ মানুষের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং পুরো আন্দোলনকে এক অপ্রতিরোধ্য গতিবেগ প্রদান করে।
গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণঃ শিক্ষার্থীদের অদম্য সাহস এবং নৈতিক অবস্থান সমাজের সর্বস্তরের মানুষ, বিশেষ করে পেশাজীবী, অভিভাবক ও শ্রমিক জনতাকে রাজপথে নেমে আসতে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করেছিল।
প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দক্ষ ব্যবহারঃ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও শিক্ষার্থীরা বিকল্প উপায়ে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে রাষ্ট্রীয় বর্বরতার চিত্র তুলে ধরে তীব্র আন্তর্জাতিক জনমত ও চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।
ঐতিহাসিক ক্ষমতার পরিবর্তন ও ফ্যাসিবাদের পতনঃ শিক্ষার্থীদের সুসংগঠিত প্রতিরোধ এবং একদফা দাবির মুখে দীর্ঘদিনের চেপে বসা একনায়কতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটে, যা দেশের ইতিহাসে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করে।
পরবর্তী শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগঃ স্বৈরাচার পতনের পরপরই ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় পাহারা দেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের অসাধারণ নাগরিক দায়িত্ববোধ ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যয় প্রদর্শন করেছে।